অন্ধকারে নিমজ্জিত জনপদের মশালধারী বিপ্লবী কাফেলা

অন্ধকারে নিমজ্জিত জনপদের মশালধারী বিপ্লবী কাফেলা

যুব কলাম

কাজী সফি আবেদীন


অখন্ড ভারতবর্ষে একটানা ৮ শত বছর শাসন করেছিলেন মুসলিম শাসকগণ, ক্ষমতার দ্বন্ধ, মহল ষড়যন্ত্র এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের ষড়যন্ত্রের কবলে ধীরে ধীরে এই বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমানা সংকুচিত হয়ে খন্ডবিখন্ড হয়ে কিছু অঞ্চল মারাঠাদের দখলে, কিছু অংশ রাজপুতানার দখলে, কিছু অংশ শিখদের দখলে চলে যায়, এক সময় এই বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্য দিল্লির লাল চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, অপরদিকে বাংলা, ওড়িষ্যা, বিহার, নবাব সিরাজুদ্দৌলার অধীনে থাকে।

এরপর বণিকের বেশে ব্রিটিশরা ভারতে আগমন করে ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতবর্ষকে গ্রাস করে ফেলে, এরপরই শুরু হয়ে যায় ইসলামিক সংস্কৃতি সভ্যতা নিশ্চিহ্ন করার পাঁয়তারা, মুসলিম মনীষীদের হত্যা, ইসলামিক স্থাপত্য এবং ইসলামিক শিক্ষা ব্যাবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়, মোটকথা ভারত থেকে ইসলামকে চিরতরভাবে বিদায় করার নীল নকশা বাস্তবায়নে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে। ইংরেজদের দুইশত বৎসরের শাসনামলে মুসলিম মনিষী, বিদগ্ধ আলেম-ওলামাদের রক্ত এমন ভাবে প্রবাহিত হয়েছিল যে, অতীতে এমন জঘন্য ঘটনার নজির পাওয় যায়নি। সর্বশক্তি প্রয়োগ করার পরেও ভারত বর্ষ থেকে তাওহীদের বাতিকে নেভাতে পারেনি।

ইংরেজ শাসক গোষ্ঠীর জুলুম অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সাধারণ মানুষ যখন বাঁচার আশা টুকু ছেড়ে দিয়েছিল তখন জায়গায় জায়গায় ফুঁসে উঠেছিল মুসলিম মনিষীগণ, ইংরেজদের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ একসময় সাধারণ মানুষের আশার আলো হিসাবে দেখা দেয়, ফলে আলেমদের সাথে সর্বসাধারণ একাত্মতা পোষণ করে ইংরেজ খেদাও আন্দোলনকে শক্তিশালী করে এবং ১৯৪৭ সালে চূড়ান্তভাবে ব্রিটিশদেরকে বিতাড়িত করে ভারতবর্ষ থেকে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বৃটিশরা চলে গেছে, কিন্তু তারা এমন কিছু বীজ বপণ করে গিয়েছে, যাতে করে শতাব্দী থেকে শতাব্দী মানুষের মাঝে সাম্প্রদায়িকতা, জাতিগত দাঙ্গা লেগে থাকে, এজন্য তারা এক জাতিসত্ত্বা থেকে হিন্দু মুসলিম বিভাজন এর মাধ্যমে ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানের এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্ম দিয়ে যায়, অপরদিকে অমীমাংসিত কাশ্মীরের সীমারেখার যাতে করে যুগ যুগ ধরে ভারত পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষ লেগে থাকে সেই নীল নকশা তৈরি করে দিয়ে যায়।

১৯৭১ সালে আমরা অত্যাচার জুলুমের বিরুদ্ধে দীর্ঘ এক সংগ্রামের পর একটি স্বাধীন জাতিসত্ত্বা হিসেবে পরিচিতি লাভ করি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যেই লক্ষ্যে এই সংগ্রাম হয়েছে স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দীর পরেও আমরা কি সেই সুখ পেয়েছি? সুশীল সমাজের নামে এলিট পার্সন নাগরিক দাবীদার নামধারী পশ্চিমা মদদপুষ্ট কিছু এজেন্ট স্বাধীনতার এই চেতনাকে পুঁজি করে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়ে এই মুসলিম জনপদ কে অশান্ত করে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে দাড়ি-টুপি ওয়ালাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে করে সাধারণ মানুষ দাড়ি টুপিওয়ালাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে ধর্ম বিমুখ হয়ে যায়, এতে তারা সফল না হতে পেরে দ কখনো মুসলিম সাংস্কৃতির উপরে আঘাত, কখনো ইসলামিক মুল্যবেধের উপর আঘাত, কখনো ইসলাম বিরোধী সংবিধান রচনা, কখনো স্যাকুলারিজমের বিজ বপনের তৎপরতা, কখনো হিন্দু মুসলিম সম্প্রতি বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র, সর্বশেষ আমাদেরশিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার পায়তারা করে যাচ্ছে।

চেতনার মোহরধারী ভিনদেশীদের এই এজেন্টরা একটি শান্ত জনপদ কে অশান্ত করে তুলেছে, ধীরে ধীরে অমুসলিমদের মাঝে ইসলাম বিদ্বেষ, সু-কৌশলে মুসলমানদের মধ্যে অমুসলিমদের প্রতি ঘৃণার চর্চা সহ নানা সাম্প্রদায়িক তৎপরতা, শাসক শ্রেণীর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতায় এই শান্ত বাংলাদেশকে আরো অশান্ত করে তুলেছে, বৃহৎ ইসলামিক শক্তিকে স্বার্থের ও অর্থের জালে জড়িয়ে খন্ড বিখন্ড করে দিয়ে শক্তিহীন করে দিয়েছে, একের পর এক কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী আইন বাস্তবায়ন, মুসলিম মূল্যবোধে উপর বিভিন্ন রকমের আঘাত, নাস্তিক্যবাদের চর্চা সহ নানান অপ-তৎপরতা চালানোর মাধম্যে দেশ ও জাতীকে একটি অন্ধকার জনপদের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছে।

জাতীর এই ক্লান্তিলগ্নে ইসলামের মশাল হাতে ময়দানে অবতীর্ন হয়েছিলেন এক আপোষহীন নেতা, সৈয়দ মোহাম্মদ ফজলুল করিম (পীর সাহেব চরমোনাই রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) এই জাতীকে অন্ধকার থেকে মুক্ত করে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য ইসলামী (শাসনতন্ত্র) আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠা করেন ধীরে ধীরে এই সংগঠনটি গণমানুষের আস্থার স্থান হিসেবে গ্রহনযোগ্যতা লাভ করে, এই মাশালধারী কাফেলা সর্বসাধারণের মধ্যে ব্যাপকতা লাভের উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে যুব সমাজ, “আদর্শবান যুবকরা জাগলে জাগবে বাংলাদেশ” এই স্লোগাণের মাধ্যমে ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশের পথযাত্রা শুরু হয় প্রায় ছয় বছর পূর্বে, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এই সংগঠনটি আপামর জনতা বিশেষ করে যুবক শ্রেণির বিপ্লবী কাফেলা হিসেবে বিস্তার এবং গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে শহর থেকে মফস্বল পর্যন্ত এই সংগঠনটি আলো ছড়িয়ে পড়ে।

সর্বশেষ চতুর্থ জাতীয় যুব কনভেনশন এর মাধ্যমে সমগ্র জাতি একটি সুশৃংখল যুবশক্তিকে প্রত্যক্ষ করে, কেন্দ্রীয় কমান্ড থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত উক্ত সংগঠনের নেতা কর্মীদের কর্মকান্ড দলীয় কমান্ড এর প্রতি আনুগত্য, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার যুব সমাজের সম্পৃক্ততা অন্ধকারে নিমজ্জিত এ জনপদের জন্য আশার আলো হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, অচিরেই এই মশালধারী বিপ্লবী কাফেলা সমাজের অন্ধকারকে দূর করে আলো নিয়ে আসবে। ইনশাআল্লাহ!

লেখক :
লেখক, গবেষক ও ইসলামী রাজনীতি বিশ্লেষক