ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর রাজনীতি ও ইবাদত

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর রাজনীতি ও ইবাদত

যুব কলাম

মুহাম্মাদ শামসুদদোহা তালুকদার


পবিত্র কুরআন মজীদে আল্লাহ তায়ালার ছোট্ট একটি নির্দেশ- ‘তোমরা সত্যশীলদের সাথী হয়ে যাও’। আল্লাহ তায়ালা প্রিয় নবী মুহাম্মাদূর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর পর আর কোন নবী বা রাসূল এ মর্ত্যে প্রেরণ করবেন না। নবুওয়াতের দরজা সীলগালা।

সময়ের ব্যবধানে তাঁর বান্দাদেরকে হেদায়েতের তাগিদ দিতে যুগে যুগে মুজাদ্দিদ ও আউলিয়া প্রেরণ করেছেন, যা হাল যামানায়ও বহাল রয়েছে। কিন্তু কতজন এসেছেন নির্ভরযোগ্যতার নিরিখে তা প্রমাণিত নয়। তবে এতদাঞ্চলে বহু আল্লাহর প্রিয় ও মাকবুল বান্দা ভূমিষ্ট হয়েছেন। তাদের আরাধ্য লক্ষ্য ছিলো – আল্লাহভোলা বান্দাদেরকে আল্লাহমুখি করা। আমরা সাধারণরা ইলম ও আমলে খুবই দূর্বল। আমরা বৈশ্বিক বিবেচনায় প্রান্তিক জনপদে বসবাস করছি। এখানে কখনো কোন রাসূল আসেননি। এখানে সাহাবা রা.ও আসেননি। মতান্তরে একজন বা দু’ জন এসেছিলেন।

আরব জাহান থেকে বহু বুযুর্গ বান্দা এতদাঞ্চলে আগমন করে ইসলামকে জিন্দা করেছেন। পৌত্তলিকতায় ভরা এ উপমহাদেশে তারা ইসলাম নামক বৃক্ষের আবাদ করেছেন। দলে দলে মানুষ ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। আর নামে মাত্র মুসলমানরা ইবাদত পালনে মনোযোগী হয়েছে।

তৎকালীন কুমিল্লার জেলার উজানীতে ক্বারী ইবরাহীম রহঃ তাঁর সময়ে দ্বীনের ব্যাপক খেদমত করেছেন। তাঁর আমলে বাংলাদেশে তরীকার কাজ উজানী থেকেই উদ্ভাসিত হয়েছে। তিনি ইলমুল মারেফাত শিখেছেন কুতুবুল আলম রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহঃ-এর থেকে। তিনি তাঁর খেলাফতপ্রাপ্ত হয়ে উজানীতে খানকা তথা দরবার স্থাপন করেন। আজকের জামিয়া ইবরাহিমিয়া তাঁর অমর কৃতিত্ব। এখানেই তিনি ৮০ বছর আগেই মাওলার সান্নিধ্যে চলে গেছেন।

গত শতাব্দির মাঝামাঝি কারী ইব্রাহিম রঃ এর খেলাফত পেয়ে চরমোনাই চলে আসেন সৈয়দ মুহাম্মদ এছাহাক রহঃ। আমরা তাঁকে চরমোনাইর দাদা পীর বলে অভিহিত করি। তাঁর ইন্তেকালের পর সুযোগ্য পুত্র মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করিম তার স্থলাভিষিক্ত হন। চরমোনাইতে আজকে যা কিছু দেখা যাচ্ছে তার ব্যাপকতা তাঁর থেকেই। এ সবের বড় কৃতিত্ব তাঁর। তিনি একজন দার্শনিক ছিলেন। তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ছিল। মহান আল্লাহ তায়ালার সাথে তার গভীর কানেকশন ছিলো।

সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করিম রঃ পীর সাহেব চরমোনাইর রত্নদ্বয় হাল যামানায় জাতির রাহবার হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন।এ জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন তারা।

চরমোনাইওয়ালারা একটি কথা বলে বেড়ায় যা শতভাগ বাস্তব দর্শনে পরিণত হয়েছে। খানকার পীর ময়দানের বীর। শায়খদ্বয় রাতে খানকার লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিয়োজিত থাকেন আর দিনে রাজপথে বিচরণ করেন। অর্থাৎ শরীয়ত ও মারেফাতের মূল্যবান মিশ্রণ। তারা পথভোলা মানুষকে পথ দেখান। অন্ধকার থেকে আলোয়। তাদেরকে দ্বীনের দীক্ষা দিয়ে সোনার মানুষে রূপান্তরিত করেন মাওলার ফজল ও করমে।

বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা আজ উচ্ছন্নে গেছে। নীতি নৈতিকতার বালাই নাই। গণভবন থেকে টং দোকান পর্যন্ত জোচ্চুরি। দূর্নীতি তথা নীতিহীনতাই আজ এ দেশের সংস্কৃতিতে সয়লাব হয়ে গেছে। ক্ষমতায় আসীন ও তাদের আশেপাশে থাকেন, তারা জনগণের টাকা মেরে খাওয়াকে অধিকারের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। হেন অপরাধ নাই যা তারা করছে না। তাদের আর্থিক দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূণ্য হতে চলেছে।

সবচেয়ে বড় আঘাতটা এসেছে ইসলাম নামক বৃক্ষের উপর। হিন্দুয়ানী শিক্ষা ও সংস্কৃতি জাতির ললাটে লেপ্টে দিচ্ছে। ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ঢেউ উঠেছে। ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রশাসনের কর্মকর্তারা গলদঘর্ম। যেনতেনভাবে বাংলাদেশের সম্পদ লুন্ঠনে ব্যস্ত তারা। এ দেশের স্বাধীনতা আজ তুচ্ছ একটা বিষয় যেন। মুসলমানদের মূল্যবোধের চেয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির ইশতেহারের মূল্য বেশী। বাংলাদেশের জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে হিন্দুয়ানি শিক্ষা ও সংস্কৃতি। জাতীয় পাঠ্যক্রমে ডারউইন ও হিন্দুদের মতবাদ অন্তর্ভুক্ত করেছে।

দেশের বর্তমান সরকার ও তাদের দোসরদের যারা অধিকাংশই স্বঘোষিতভাবে নাস্তিক, তাদের অপতৎপরতা নস্যাৎ করতে একটি সংগঠন মাঠে ঘাটে ময়দানে সর্বত্র প্রতিবাদমুখর, সেই সংগঠনটির নাম ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। আমীর তথা চরমোনাই পীর সাহেবের নির্দেশ মেনে চলা এ দলটির অস্তিত্ত¡ যতদিন আছে, ততোদিন দেশ ও মুসলমানদের স্বার্থে বিপরীতে কিছু করতে দেয়া হবে না। ইনশাআল্লাহ।

তারা হয়তো ভুলে গেছে, ‘ইন্না বাতশা লাশাদীদ’ মহান আল্লাহর শাস্তি দুনিয়া ও আখেরাতে বরাদ্দ আছে। সমস্যা হলো, তারা তো আখিরাতকে বিশ্বাস করে না। তাই তারা জীবনকে হালকা ভাবে নেয় অথবা জীবনের শেষ মানেই সবকিছু শেষ, এটাই মনে করে। আখেরাতের অস্তিত্ব এবং লাস্ট জাজমেন্টের দিন তাদের জন্য অপেক্ষা করলেও তাদের তৎপরতায় বুঝা যায় ওই জাজমেন্ট তারা মানেনা। তারা যদি পরকাল বিশ্বাস করত তাহলে বাংলাদেশ আরো ভালো থাকতো।

তারা অসৎ মানুষ, চরিত্রহীন ও নিকৃষ্ট মানুষ। আলহামদুলিল্লাহ সমাজের নিকৃষ্ট মানুষদেরকে উৎকৃষ্ট মানুষে পরিণত করার মেহনত চরমোনাইওয়ালারা করে যাচ্ছে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা সেজন্যই বলেছেন কুনু মাআসসাদিকীন। তোমরা সত্য ও সুন্দর মানুষদের সহচর্য লাভ করো । সহচর্য লাভ করনেওয়ালারা জিতবে শেষ বিচারের দিন। আর সবাই হারবে।

অনেক মানুষ আছেন যারা এখনো বলে বেড়ায়- পীর সাহেব চরমোনাই তিনি পিরালি প্রথা থেকে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেন কেন?

আমার কথা হলো, রাজনীতিতে আসতে যে যোগ্যতার প্রয়োজন সেটা কি উনাদের নাই? উনারা কি এ দেশের নাগরিক নন? উনারা কি এদেশের সৎ মানুষ নন? রাজনীতি হলো নীতিবানদের কাজ, কিন্তু তা চলে গেছে নীতিহীনদের দখলে তাই সমাজ ও রাষ্ট্রকে মেরামত করতে।

তবে মূল জবাব হলো, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাজনীতি করে ইবাদত পালনের উদ্দেশ্যে; মহান আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশ বাস্তবায়নে। ‘আমর বিল মারুফ নাহী আনিল মুনকার’ এ ঐশী বাণীর হুবহু মর্যাদা দিতে। আল্লাহর যমীনে এ’লায়ে কালিমাতুল্লাহর জন্য।

মহান আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশ মানতে গিয়ে তাদের রাজনীতিতে আসা। হাফেজ্জী হুজুর এদেশে ইবাদতের রাজনীতি কায়েম করে গেছেন। তার ধারাবাহিকতায় মরহুম পীর সাহেব হুজুর ইসলামী রাজনীতি বিকশিত করেছেন। বর্তমান শায়খদ্বয় ইসলামী রাজনীতিকে এক অনন্য উচ্ত মাত্রায় নিয়ে গেছেন।

ইসলামী রাজনীতির সংজ্ঞা কি হতে পারে? তার জবাব পাবেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দিকে তাকালে । ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এদেশের ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ, আলেম, ইমাম, এমনকি পীর-মাশায়েখদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ সংগঠনটি আলেমদের সম্মানকে ফিরিয়ে এনেছেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় ইসলামকে অধিষ্ঠিত করতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

রাষ্ট্র ক্ষমতায় ইসলামী অনুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ লড়াই করে যাচ্ছে, আলহামদুলিল্লাহ এতে ব্যাপক সাড়া পড়েছে সর্বমহল থেকে। একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খেদমতের চিত্র ও পরিসংখ্যান প্রমাণিত হবে। ইনশাআল্লাহ।

পীর সাহেব চরমোনাইর সহচর্যে আসাদের পরিসংখ্যানটা কম নয়। তারা ইসলামকে চিনেছেন তাঁর মাধ্যমে। সে কারণে শায়খদ্বয় সকলের পরম ও প্রিয় সম্পদ। পীর হয়ে রাজনীতি করা যাদের অপছন্দ, তারা একটু জবাব দিন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ যদি সক্রিয় না হতো, তাহলে তারা সবাই কি আল্লাহওয়ালা হতে পারতো? এর উত্তর আপনারাই দিন।

একদল লোক চরমোনাইর মুরীদ না, অথচ চরমোনাই শায়েখদ্বয়ের কাফেলায় আছেন। তারা সমাজ থেকে অত্যাচার-অনাচার দূর করে কোন একদিন ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা সম্বলিত কল্যাণ রাষ্ট্র কায়েম করবে। এটা মরহুম পীর সাহেব হুজুরের রাজনৈতিক দর্শনের মাজেজা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, সবাই মুরীদ নাও হতে পারে তবে এ সংগঠনের মাধ্যমে দ্বীনকে ভালোবাসবে। তারা খাছ মুরীদের মতো আমল করবে, আর ডাকিবা মাত্র রাস্তায় নেমে ইসলামের ঝান্ডা উড্ডীন করবে। । ইসলামী রাজনীতির বদৌলতে ইবাদতের হক আদায় হয়ে যাবে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সেইটা।

ওয়ামা তাওফিকী ইল্লা বিল্লাহ।

লেখক:
উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা বোর্ড
রশীদ আহমাদ গঙ্গগুহী রহঃ ভবন, চরমোনাই, বরিশাল