Featured Video Play Icon

নেতৃত্বের স্বরূপ বিশ্লেষণ

যুব কলাম

এস. এম. মাহমুদুল হাসান ভূঁইয়া


যে কোন আন্দোলনের নেতৃত্ব একটি প্রধান ফ্যাক্টর। তবে ইসলামী সংগঠনের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের ভূমিকা আরো তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এ আন্দোলন কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক হওয়ায় নেতা যখন তা পরিপূর্ণ মেনে চলেন, তখন তিনি হন সকলের অনুকরণীয়। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে নেতা হতে পারেন একটি সফল গণবিপ্লবের রূপকার, এনে দিতে পারেন “বিজয়ী আদর্শের” উড্ডিন পতাকা।

নেতৃত্ব কি এবং কেন?
ইসলামী পরিভাষায় নেতা হল ঢাল স্বরুপ যাকে সামনে রেখে লড়াই করা যায় এবং আত্মরক্ষা করা যায়। রাসূল ﷺ বলেন নেতার বাইয়াত গ্রহণ ব্যতীত মারা গেলে তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু। তাই নেতা নিয়োগ উম্মাহের জন্য ওয়াজিব।

নেতৃত্বের আনুগত্য ও বাইয়াত:
সুরা নিসায় ৫৯ নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসুল ﷺ এর এবং সে সব লোকেরও যারা তোমাদের মধ্যে সামরিক দায়িত্ব সম্পন্ন।

সূরা ফাতাহ ১৮ নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে রাসূল! যে সব লোক আপনার নিকট বাইয়াত হচ্ছিল, তারা আসলে আল্লাহর নিকটই বাইয়াত হচ্ছিল। তাদের হাতের উপর আল্লাহর কুদরতের হাত ছিল।

হযরত উবাদা রা. বলেন, আমরা রাসূল ﷺ এর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেছি শ্রবণ ও আনুগত্যের ব্যাপারে এবং এটা স্বাভাবিক অবস্থা, কঠিন অবস্থা, আগ্রহ-অনাগ্রহ সর্বাবস্থায়ই প্রযোজ্য। আমরা আরো বাইয়াত গ্রহণ করেছি যে, আমরা কোন ব্যাপারে দায়িত্বশীলদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হবো না এবং সর্বাবস্থায়ই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার ব্যাপারে কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে পরোয়া করবো না। (নাসায়ী)

কোরআনের আলোকে নেতার গুণাবলী:
পবিত্র কুরআনে ইব্রাহিম আ. এর গুনাবলী হিসেবে দেখা যায় তিনি–
১) তাওহীদের প্রশ্নে আপোসহীন।
২) আল্লাহর প্রতি নিবেদিত প্রাণ।
৩) ঈমানের পরীক্ষা উত্তীর্ণ ছিলেন।

অপর দিকে হযরত মূসা আ. এর সম্পর্কে কুরআনে দেখা যায় তিনি শক্তিশালী ও আমানতদার ছিলেন এবং সকল নবী রাসূলগণ আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করেছেন।

সূরা তওবার ১২৮-১২৯নং আয়াতে রাসূল ﷺ সম্পর্কে চারটি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে-
১) মানুষের দুঃখ-কষ্ট হৃদয় দিয়ে অনুভব করে তা দূর করার জন্য তিনি হয়ে পড়েছেন পেরেশান বা ব্যস্ত।
২) কিসে মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন মঙ্গল হতে পারে তা নিয়ে তিনি সদাসর্বদা চিন্তা-ভাবনা করেছেন।
৩) নবী ছিলেন মুমিনদের প্রতি দয়া পরবশ কিন্তু সে কারণে কখনোই আদর্শচ্যুতি বা দয়িত্ব পালনের দুর্বলতা প্রদর্শন করেননি।

সূরা আল ইমরানের ১৫৯নং আয়াতে বলা হয়েছে-
১) নবী পাকের দিল ছিল অত্যন্ত নরম ও কোমলতায় পরিপূর্ণ।
২) মেজাজ কড়া বা রুক্ষ ছিল না।
৩)  সাথীদের কাজের প্রতি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি দেওয়া এবং আল্লাহর কাছে তাদের জন্য ক্ষমা চেয়ে দোয়া করা।
৪) কাজকর্মে পরামর্শ করা।
৫) সিদ্ধান্ত নিলে তা বাস্তবায়ন দৃঢ় মনোবলের পরিচয় দেওয়া আর এর সমস্ত কাজে আল্লাহর উপর ভরসা করা।

সূরা আল ফাতাহ’র ২৯ নং আয়াতে এ আরও বলা হয়েছে–
১) কাফেরদের মোকাবেলায় কঠোর।
২) সঙ্গীগণ তথা সাহাবীদের প্রতি রহম দিল।
৩) তাঁদের দেখতে পাবে তারা হয় রুকু-সেজদা বা আল্লাহর ফজল এবং রেজামন্দি তালাশে নিয়োজিত আছে।
৪) তাদের চেহারায় সেজদার ছাপ বিদ্যমান যা দ্বারা তাঁদের সহজেই চেনা যায়।

হাদিসের আলোকে নেতার গুণাবলী:
১) রাসূল ﷺ বলেন,  “তোমাদের সে নেতাই উত্তম নেতা যাদেরকে তোমরা ভালোবাসো এবং তারাও তোমাদের কে ভালোবাসেন। তোমরা তাদের জন্য দোয়া করো আর তারাও তোমাদের জন্য দোয়া করেন।
২) নিজ দায়িত্ব বুঝে নেওয়া প্রথম দায়িত্ব। যথাসাধ্য সহজভাবে আঞ্জাম দিতে প্রয়াস পাওয়া। হাদীসে বলা হয়েছে “তোমরা নিজেদের উপর কৃত্রিমভাবে কোন কড়াকড়ি আরোপ করনা তাহলে আল্লাহ তোমাদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে বসবেন।”
৩) আল্লাহ যখন কোন জাতির কল্যাণ চান, তখন তাদের ওপর সহনশীল লোকদের নেতৃত্ব দান করেন। তাদের মধ্যকার বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব ও জ্ঞানী লোকদের উপর অর্পণ করেন। দাতা লোকদেরকে অর্থ সম্পদ দান করেন।
৪) রাসূল ﷺ বলেন, আল্লাহ দরদী, তিনি দরদপূর্ণ আচরণই পছন্দ করেন। তিনি দরদপূর্ণ আচরণের বিনিময়ে এমন কিছু দিয়ে থাকেন, যা রাগী বদমেজাজী লোকদেরকে কখনো দেন না। এমনকি আল্লাহ তার এই বিশেষ দান, বিশেষ অনুগ্রহ আর কোন কিছুর বিনিময়েই দেন না।” (বুখারী ও মুসলিম)
রাসূল ﷺ বলেন আমি ব্যাপক অর্থবোধক সংক্ষিপ্ত জ্ঞানের যোগ্যতাসহ আবির্ভূত হয়েছি। (সুবক্তা)
৫) রাসূল ﷺ ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি তিনি শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই প্রতিশোধ নিয়েছে। (বুখারী ও মুসলিম)

নেতৃত্ব দানের যোগ্যতা অর্জনের মাপকাঠি:
তিনটি গুণের অধিকারী না হয়ে কোন ব্যক্তির আমর বিল মারুফ এবং নাহি আনিল মুনকারের কাজে আত্মনিয়োগ করা উচিত নয়। গুণ তিনটি হলো–
১) যাকে হুকুম দেবে বা নিষেধ করবে তার প্রতি দরদী সংবেদনশীল হতে হবে।
২) যে ব্যাপারে নিষেধ করবে সে বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে।
৩) যে ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করবে সেক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ইনসাফ করতে সক্ষম হতে হবে। (দায়লামী, মিনহাজুস সালেহীন)

কোরআনের আলোকে নেতার মৌলিক দায়িত্ব কর্তব্য:
সূরা জুম’আ: ২নং আয়াতের আলোকে নেতার মৌলিক দায়িত্ব–
১) কোরআনের আয়াত আবৃত্তি করে শোনানো।
২)  বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল প্রকার অপবিত্রতা থেকে পবিত্র করা।
৩) কিতাব (কুরআন) ও হিকমত (সুন্নাহ) শিক্ষা দেওয়া। এক কথায় সব ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া।

হাদিসের আলোকে নেতার মৌলিক দায়িত্ব কর্তব্য:
ওমর রা. বলেন, জেনে রেখো তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক ও দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই  নিজ নিজ অধীনস্থ লোকদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। অতএব একজন নেতা যিনি অধীনস্ত লোকদের রক্ষক। তার স্বীয় অধীনস্থদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। (বুখারী ও মুসলিম)

ইয়াসার রা. হতে বর্নিত রাসূল সা. বলেন, যে ব্যক্তি মুসলমানদের সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণ করার পরও তাদের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করবে, আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন। (বুখারী ও মুসলিম)

পরিশেষে হযরত ওমর রা. বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করি যে, “সংগঠন ছাড়া ইসলাম হয়না; নেতৃত্ব ব্যতীত সংগঠন হতে পারে না; আর আনুগত্য ব্যতীত নেতৃত্ব কল্পনা করা যায় না।” (সুনানে দায়েমী)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উর্ধ্বতন নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করার সাথে সাথে নিজেদেরকেও যোগ্য নেতা হওয়ার তৌফিক দান করুক আমিন।

লেখক: দাওয়াহ্ ও প্রশিক্ষণ সম্পাদক
ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশ
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ

সহযোগিতায়: ১/ ইসলামী আন্দোলন বিজয়ের শর্তাবলী
২/ ইসলামী আন্দোলনে সাংগঠনিক জীবনের প্রয়োজনীয়তা
৩/ তাওযীহুল কুরআন ও বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থ